Men’s Rights News & Documentationরিপোর্ট
পুলিশ সদস্য আবদুল কুদ্দুসের আত্মহত্যা এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থা ও আইনের একপেশে বাস্তবতার দলিল

বিস্তারিত
২০২০ সালের ২৩ জানুয়ারি রাজধানীর মিরপুর পুলিশ লাইন মাঠে নিজের ইস্যুকৃত অস্ত্র দিয়ে বুকে গুলি চালিয়ে আত্মহত্যা করেন পুলিশ সদস্য আবদুল কুদ্দুস (৩১)। আত্মহত্যার পূর্বে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিস্তারিত স্ট্যাটাস দিয়ে তার পারিবারিক মানসিক নির্যাতন, স্ত্রী ও শাশুড়ির প্ররোচনার কথা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে যান। স্ট্যাটাসের মূল সুর ও সার্বিক প্রেক্ষাপট থেকে এটি পরিষ্কার ফুটে ওঠে যে, স্ত্রী ও শাশুড়ির মানসিক অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে বাধ্য হয়েই তিনি আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক পথ বেছে নিয়েছিলেন।
ঘটনার পরপরই পুরুষ অধিকার রক্ষায় নিয়োজিত সংগঠন ‘‘এইড ফর মেন ফাউন্ডেশন’ ভিকটিম পরিবারের পাশে দাঁড়ায় এবং ন্যায়বিচারের দাবিতে একাধিক কর্মসূচি পালন করে:
রাজপথে প্রতিবাদ ও মানববন্ধন (২৫ জানুয়ারি ২০২০): সংগঠনের সভাপতি ড. আব্দুর রাজ্জাক খাঁন এবং সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম নাদিমসহ নেতাকর্মী ও সাধারণ পুরুষেরা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে আত্মহত্যার প্ররোচনাকারী স্ত্রী ও শাশুড়ির দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানান।
মামলা দায়ের ও প্রশাসনিক বাধা অতিক্রম: নিহত পুলিশ সদস্যের বড় ভাই তৎকালীন সময়ে পুলিশের এএসআই (Assistant Sub-Inspector) পদে কর্মরত ছিলেন (সময়ের ব্যবধানে বর্তমানে তার পদোন্নতি হয়ে থাকতে পারে)। অথচ নিজের ভাই পুলিশ কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও পুলিশ প্রথমে এই আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলাটি গ্রহণ করতে একদমই ইচ্ছুক ছিল না। পরবর্তীতে ‘এইড ফর মেন ফাউন্ডেশন’-এর প্রতিনিধি দল সরাসরি থানায় উপস্থিত হয়ে আইনি যুক্তি তুলে ধরে ও সামাজিক চাপ তৈরি করে পুলিশকে মামলা গ্রহণে বাধ্য করে।
মামলা নেওয়ার পর পুলিশ প্রশাসন যেভাবে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেছে, তা প্রশাসনিক কাঠামোর একপেশে রূপকে উন্মোচিত করে:
মনগড়া ও পক্ষপাতদুষ্ট তদন্ত রিপোর্ট: স্পষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্ট্যাটাস এবং পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণ থাকা সত্ত্বেও পুলিশ প্রশাসন প্রথম থেকেই বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। পরবর্তীতে তারা একটি মনগড়া তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয়, যেখানে ইচ্ছা করেই অভিযুক্ত স্ত্রী ও শাশুড়িকে কোনো দোষী বা 'গিলটি' হিসেবে দেখায়নি।
রাষ্ট্রীয় সংস্থার কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা: পুলিশের এই ধরনের পক্ষপাতমূলক রিপোর্টের পর যদি মামলাটি পিবিআই (PBI) বা সিআইডি (CID)-এর মতো প্রতিষ্ঠানে পুনঃতদন্ত বা পর্যালোচনার (Review) জন্য পাঠানোও হতো, তাহলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। কারণ এই সংস্থাগুলো একই রাষ্ট্রীয় পুলিশ কাঠামোর অংশ। সাধারণত সরকারি বা রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো পুরুষের ওপর নারী কর্তৃক মানসিক নির্যাতন বা আত্মহত্যার প্ররোচনার ক্ষেত্রে কঠিন বা নিরপেক্ষ তদন্ত রিপোর্ট দিতে চান না।
এই ঘটনায় সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ও অন্যায্য দিকটি ছিল নিহত পুলিশ সদস্যের পরিবারের করুণ বাস্তবতা ও আইনি বৈষম্য:
বৃদ্ধা ও অসুস্থ মায়ের চরম বঞ্চিত হওয়া: নিহত আবদুল কুদ্দুসের মা ছিলেন অত্যন্ত অসুস্থ ও বৃদ্ধা। পরিবারের স্বাভাবিক প্রত্যাশা ছিল যে, ছেলের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় অনুদান বা পেনশনের একটা অংশ হয়তো এই অসহায় বৃদ্ধা মা পাবেন।
অপরাধীর অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়া: প্রচলিত পুলিশি বিধিমালা ও রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী, নিহত পুলিশ সদস্যের যাবতীয় পেনশনের টাকা ও রাষ্ট্রীয় অনুদানের একমাত্র আইনগত মালিক হন তার স্ত্রী। পরিবারের পক্ষ থেকে চরম ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে বলা হয়—যেই স্ত্রী ও শাশুড়ির মানসিক নির্যাতনে এবং আত্মহত্যার প্ররোচনায় তাদের ভাই মারা গেল, সেই প্ররোচনাকারী স্ত্রীই আবার রাষ্ট্রীয় আইনি ব্যবস্থার কারণে সব টাকা-পয়সা পেয়ে আরামে ও সুখে দিন কাটাবে! নিহতের অসুস্থ ও বৃদ্ধা মা, ভাই বা বোনরা এর থেকে কিছুই পাবেন না।
রাষ্ট্রীয় আইনি সন্ত্রাস ও দ্বিমুখী নীতি: প্ররোচনাকারী নারী কোনো শাস্তি পাওয়া তো দূরের কথা, উল্টো রাষ্ট্রীয় বিধির কারণে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে—যা ভিকটিম পরিবারের জন্য ছিল চরম হতাশাজনক, কষ্টের এবং এক প্রকার রাষ্ট্রীয় আইনি অন্যায়। পাশাপাশি অন্য যেকোনো ঘটনায় কোনো নারী আত্মহত্যা করলে তাৎক্ষণিকভাবে স্বামীকে গ্রেফতার করা হলেও, পুরুষের আত্মহত্যার ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্ত নারীদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নিতে প্রশাসন বরাবরই উদাসীন।
আবদুল কুদ্দুসের এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ‘এইড ফর মেন ফাউন্ডেশন’-এর অতীত আর্কাইভের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল (Historical Document)। এটি প্রমাণ করে যে, পূর্বেও যেভাবে পুরুষরা পারিবারিক সহিংসতা, রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর পক্ষপাতমূলক আচরণ এবং বৈষম্যমূলক আইনের শিকার হয়ে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছে, বর্তমানেও সেই একই সংকট বজায় রয়েছে। সংগঠনটি পূর্বেও যেমন এই অবিচারের বিরুদ্ধে রাজপথে ও আইনি লড়াইয়ে অবদান রেখেছিল, বর্তমানেও পুরুষদের আইনি সুরক্ষা ও রাষ্ট্রীয় বৈষম্যমূলক আইনের সংস্কারের দাবিতে তাদের এই আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে।